বাদল ঘোষের প্রয়াণ ও আমার স্মৃতি কথা

ড, মোহাম্মদ ইউনুস: বাদল ঘোষ, আমাদের সবার বাদল দা, শনিবার ১৩ই এপ্রিল ২০২৪,  আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। ছোট কাল থেকে তার সাথে আমার সখ্যতা। তিনি ছিলেন একজন সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন স্বভাবের মানুষ। কারও সঙ্গে বিভেদ এ জড়াতেন না।

বাদল দা সুন্দর ফুটবল খেলতেন। আমাদের কাচারীপাড়ার বাড়ির সামনেই ছিল জিসিআই স্কুলের খেলার মাঠ। প্রতিদিন বাদল দা খেলোয়াড়দের মতো  জুতা, মুজা ও পরিচ্ছন্ন./ সুন্দর ড্রেস পরে বেলা ৩.৩০ মিনিটেই মাঠে চলে আসতেন। বাদল দার ভাই ভোলা দা  তখন শরীর চর্চায় ব্যস্ত। খেলার মাঠে সবাই একে একে করে চলে আসতো। সবিরণ দা, আবাহানীর মনিভাই, চুকু ভাই, মন্ডলপাড়ার লালমনি, সাধু পাড়ার দুই ভাইঃ ঝুল ও মিলু, জাহাজ প্যার্টান বাড়ির দুই ছেলে, কমিশনার ওহাব, কাচারীপাড়ার আজম ভাই, বিরেন দা, কাচারীপাড়ার  মুকু- সবাই একে একে মাঠে চলে আসতেন। তখন  বাদল দা ও আগত খেলোয়াড়দের ফুটবল প্রাকটিস শুরু হয়ে যেত।  প্রাকটিস  শেষে আমরা কিছু জুনিয়ারঃ আমি, শান্তা, বাবু, তোতন (প্রয়াত), নুপুর, মিন্টু  মারুফ ভাই, টারজান ভাই, সিদ্দিক, অন্তু সহ অনেকেই একসাথে দুইটা টিম করে আমরা খেলা শুরু করতাম। সেটা ছিল আমার ছেলেবেলার সুন্দরতম স্মৃতি। বাদল দার কাছে অনেকগুলো বল থাকতো। বাদল দা এডওয়ার্ড মহাবিদ্যালয়ের ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে ইলেকশনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমরা তখন জেলা স্কুলের ছাত্র। কিন্তু বাদল দার ইলেকশনে আমরা দল বেঁধে এডওয়ার্ড কলেজে যেতাম বাদল দার জন্যে  ভোট চাইতে।

আমাদের কাচারীপাড়ার মধ্যে একটা খেলার আমেজ তৈরি করতেন বাদল দা। ৪’-৬’’ ইঞ্চি উচ্চতার খেলোয়ারদের নিয়ে আমাদের কাচারীপাড়াকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে, বিভিন্ন নামে আমাদের মধ্যে প্রতিযোগীতামূলক ফুটবল ম্যাচ হতো। এখানে বাদল দার ভূমিকা থাকতো মুখ্য। আমার টিমের নাম ছিল দুর্বার। বাদল দা আমাদের টিমের মুখ্য অর্থদাতা ছিলেন যা দিয়ে আমরা জার্সি সহ খাবার দাবার এর কাজ চলে যেত।

আমাদের কাচারীপাড়ায় বিচিত্রা সন্ধ্যা হতো। প্রয়াত বাচ্চু ভাই (পাবনার মেয়র ও সদর উপজেলার চেয়ারম্যান), মাখন ভাই, বাদল দা ও আমি ছিলাম প্রধান আয়োজক। সেখানেও বাদল দা আমাদের সাথে তাদের লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভান্ডারে যেয়ে নিমাই দার কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে দিতেন।

প্রায় প্রতিটি পুজায় বাদল দার বাড়িতে আমরা ‘ভোগ’ খেতাম। লুচি, সব্জি ও রাজভোগ থাকতো মেনু হিসাবে। সেই অমৃত স্বাদ আর কখনো কোথাও পাই নাই।

১৯৮০-৮৫ সনে বাচ্চু ভাই তখন  জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আর আমি ছিলাম সদর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি। সে সময় ছিল বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জাসদের একচ্ছত্র সময়; তাদের ভয়ে আমরা ছাত্রলীগ কর্মীরা কথা বলতে পারতাম না। বাচ্চু ভাই, আমি ও বাদল দা মিলে তখন আমরা ছাত্রলীগকে সংগঠিত করি। সে সময় বকুল ভাই, বিশুভাই, নিশু ভাই ও নিলুভাইয়ের সহযোগিতায় আমরা কাচারীপাড়া, মন্ডলপাড়া ও সাধুপাড়াতে সংগঠিত হই। এ সময় বাদল দা আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতেন। দিন রাত্রি আমরা একসাথে বসে আলাপ আলাচনা করতাম যে কিভাবে সারা পাবনাতে আমরা নেতৃত্ব স্থাপন করবো। বাদল দা ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ও পরবর্তীতে  আওয়ামীকে সংগঠিত করার কাজের অবদান অনস্বীকার্য।

রীতা দি, পরবতীতে বাদল দার সহধর্মীনি, অসম্ভব ভাল গান গাইতেন। দিদি আমাদের কাচারিপাড়ার বিচিত্রা সন্ধ্যতে অসম্ভব সুন্দরগান গাইলেন। আমার যতদুর মনে পড়ে বাদল দাব সংগে তার প্রথম পরিচয় হয় ওখানে ও পরবর্তীতে এডওয়ার্ড কলেজে । বাদল দা ও বৌদির মেয়েরা আজ উচ্চ শিক্ষিত।

আমাদের ছাত্রলীগের যে কোন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বাদল দা তার ভাই নিমাইদার কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে আসতেন। আমাদের মহল্লার বার্ষিক বনভোজনেও তার অবদান অনস্বীকার্য। বাদল পরিবহনের গাড়ীও সরবরাহ করতেন।

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। হঠাৎ বাসষ্ট্যান্ড দেখা বাদলদার সাথে। আমি ঢাকায় আসবো, আমার কাছে বেশ কিছু জিনিষপত্র। বাদলদা ড্রাইভারকে বললেন যেন আমার কাজ থেকে টিকিটের টাকা না নেয় এবং মালমালগুলি শ্যামলিতে নামিয়ে দিয়ে গাড়ীতে তুলে দেয় । তখন আমরা ধানন্ডিতে থাকতাম। এরপর ঘটনা প্রায়ই ঘটতো- বাদল দা আমার কাছ থেকে টাকা নিতে বারণ করতেন ড্রাইভারকে।

অষ্টোলিয়া থেকে মাঝে মাঝে বাদল দার সঙ্গে কথা হতো। বাদল দা বলতেন ইউনুস আজ তুমি অনেক বড় মানুষে পরিণত হয়েছো । অষ্ট্রেলিয়াতে শিক্ষক ও গবেষক হয়েছো আমাদেরকে ভুলো না। শেষবারে যখন কথা হলো তখন বাদল দা গর্ব করে বললেন ইউনুস আমার মেয়েদেরকেও আমি উচ্চ শিক্ষিত করেছি তোমার পরিবারকে মডেল হিসেবে দেখে।

প্রতিদিন আমরা সকালে একসঙ্গে হাঁটতাম। সেইদিনগুলো অনেক সুন্দর ছিল। পরিচ্ছন্ন মনের বাদল দা আমাদের ছেড়ে গেছেন। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা পোষণ করছি। সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে স্বর্গ বাসী করেন।

 

ড, মোহাম্মদ ইউনুস

সভাপতি, বাংলাদেশ অষ্টোলিয়া হাব

www.bah.org.au

সাবেক একাডেমিক ও গবেষক

ফ্লিন্ডাস বিশ্ববিদ্যালয় ও এ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়

দক্ষিণ অষ্টেলিয়া, অষ্টেলিয়া। Younusmaf@yahoo.com