July 3, 2020

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন : দেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছে

দেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছে। ২০১৯ সালের হিসাবে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ৭২ দশমিক ৬ বছর, যা ২০১৮ সালে ৭২ দশমিক ৩ বছর ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার রাজধানীর আগাঁরগাওয়ে পরিসংখ্যান ভবনের মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী, বিবিএসেরর উপ-মহাপরিচালক ঘোষ সুব্রত উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক এ কে এম আশরাফুল হক।
মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিক অব বাংলাদেশ (এমএসভিএসবি) তৃতীয় পর্যায় প্রকল্পের আওতায় দেশের ২ হাজার ১২টি নমুনা এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের হিসাবে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ৭২ দশমিক ৬ বছর, যা ২০১৮ সালে ৭২ দশমিক ৩ বছর ছিল। এছাড়া ২০১৭ সালে ৭২ বছর, ২০১৬ সালে ৭১ দশমিক ৬ বছর এবং ২০১৫ সালে ছিল ৭০ দশমিক ৯ বছর। প্রত্যাশিত গড় আয়ু পুরুষের চেয়ে নারীদের বেশি। ২০১৯ সালে পুরুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৭১ দশমিক ১ বছর। ২০১৮ সালে ছিল ৭০ দশমিক ৮ বছর। ২০১৭ সালে ৭০ দশমিক ৬ বছর, ২০১৬ সালে ৭০ দশমিক ৩ বছর এবং ২০১৫ সালে ছিল ৬৯ দশমিক ৪ বছর। অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০১৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রত্যাশিত গড় আয়ু হচ্ছে ৭৪ দশমিক ২ বছর, ৭৩ দশমিক ৮ বছর, ৭৩ দশমিক ৫ বছর, ৭২ দশমিক ৯ বছর ও ৭২ বছর।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের এখনও হাজারে ২১ জন শিশু জন্মের পর পরই মারা যায়। প্রতি হাজার জীবিত জন্ম নেয়া শিশুর ক্ষেত্রে মরণশীলতার হার দাঁড়িয়েছে ২১ জনে, যা ২০১৫ সালে হাজারে ২৯ জন ছিল। এছাড়া ২০১৯ সালে এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু কমে হয়েছে হাজারে এক দশমিক সাত জন, যা ২০১৫ সালে ছিল দুজন। অন্যদিকে মাতৃ মৃত্যুর হারও কমেছে। এটি গত পাঁচ বছরে সমহারে কমেছে। ২০১৫ সালে মাতৃ মৃত্যুর অনুপাত ছিল এক দশমিক ৮১, যেটি ২০১৯ সালে কমে ১ দশমিক ৬৫ তে দাঁড়িয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, খানা (পরিবার) প্রধানের ক্ষেত্রে পুরুষ ৮৫ দশমিক চার শতাংশ এবং নারী ১৪ দশমিক ছয় শতাংশ, যা ২০১৫ সালের তুলনায় নারীদের ক্ষেত্রে বেড়েছে। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে কমেছে। ট্যাপ বা নলকূপের পানি ব্যবহার করছে ৯৮ দশমিক এক শতাংশ পরিবার, যা ২০১৫ সালে ৯৭ দশমিক নয় শতাংশ ছিল। বর্তমানে দেশে মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিম হচ্ছে ৮৮ দশমিক চার শতাংশ, যা ২০১৫ সালে ছিল ৮৮ দশমিক দুই শতাংশ। হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মের জনসংখ্যা ১১ দশমিক ছয় শতাংশ, যা ২০১৫ সালে ছিল ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশে কাঁচা পায়খানা (ল্যাট্রিন) ব্যবহারকারী পরিবারের আনুপাতিক হার কমলেও এখনও প্রায় ১৯ শতাংশ পরিবার উন্মুক্ত স্থানে বা কাঁচা পায়খানা ব্যবহার করে। আর স্যানিটারি পায়খানা ব্যবহার করে ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার, যা ২০১৫ সালে ছিল ৭৩ দশমিক পাঁচ শতাংশ।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে বয়স্ক শিক্ষার হার (১৫ বছর বা তার বেশি) পল্লী এলাকার চেয়ে শহর এলাকায় প্রায় ২০ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। ৭ বছর বা তার বেশি বয়স্ক শিক্ষার ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ১৭ দশমিক দুই শতাংশ। তবে ২০১৩ সাল থেকে শহর এলাকার তুলনায় পল্লী এলাকায় বয়স্ক শিক্ষার হার দ্রুত গতিতে বাড়ছে। মরণশীলতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি হাজার মানুষের মধ্যে মরণশীলতা ছিল চার দশমিক ৯ জন, ২০১৫ সালে এটি পাঁচ দশমিক একজন ছিল।
বাংলাদেশে জনসংখ্যা যেন গাণিতিক মডেল বুঝে গেছে। সেটা অনুসরণ করেই প্রতিবছর জনসংখ্যা বাড়ছে। গত পাঁচ বছর ধরে ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। এই সময়ে প্রতিবছর ১৯ থেকে ২০ লাখ করে মানুষ বেড়েছে। ২০১৫ সালে দেশে জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৮৯ লাখ। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে হয়েছে তা ১৬ কোটি ৬৫ লাখ।
প্রতিবেদনটি বলছে, ২০১৯ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৬৫ লাখ। তার মধ্যে পুরুষ আট কোটি ৩৩ লাখ ৩০ হাজার এবং নারী আট কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার। ২০১৫ সালে দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৮৯ লাখ, ২০১৬-তে ১৬ কোটি আট লাখ, ২০১৭-তে ১৬ কোটি ২৭ লাখ, ২০১৮-তে ১৬ কোটি ৪৬ লাখ। পাঁচ বছর ধরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার একই রয়েছে- ১.৩৭%। সে হিসাবে পাঁচ বছরের দেশে জনসংখ্যা বেড়েছে ৭৬ লাখ।
মোট জনসংখ্যার মধ্যে শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সী মানুষ রয়েছে ২৮.৫%, ১৫ থেকে ৪৯ বয়সী ৫৪.৬%, ৫০ থেকে ৫৯ বয়সী ৮.৭% এবং ৬০ বছরের বেশি মানুষ রয়েছে ৮.২ শতাংশ। পুরুষের মধ্যে ২৮ দশমিক ৮ শতাংশের বয়স শূন্য থেকে ১৪ বছর, ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৪৯ বছর, ৮ দশমিক ৮ শতাংশের বয়স ৫০ থেকে ৫৯ বছর এবং ৮ দশমিক ৭ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের উপরে।
নারীর মধ্যে ২৮ দশমিক ৩ শতাংশের বয়স শূন্য থেকে ১৪ বছর, ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৪৯ বছর, ৮ দশমিক ৬ শতাংশের বয়স ৫০ থেকে ৫৯ বছর এবং ৬০ বছরের বেশি রয়েছে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ নারী।
দেশের মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশই অন্যের ওপর নির্ভরশীল। তার মধ্যে গ্রামের ৫৫ শতাংশ এবং শহরে ৪৬ শতাংশ মানুষ নির্ভরশীল। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব এক হাজার ১২৫ জন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, উন্নয়নে সঠিক তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাঠ পর্যায় থেকে বিশুদ্ধ তথ্য তুলে আনতে হবে। বিষয়টি সবাইকে মনে রাখতে হবে যে, তথ্য যত সঠিক হবে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ততই বাস্তবসম্মত হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাতে প্রতিবেদন তৈরির জন্য পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তবে তা শুনছে না বিবিএস। মঙ্গলবারও (৩০ জুন) ‘মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ (এমএসভিএসবি) ৩য় পর্যায়’ প্রকল্পের ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস-২০১৯’ এর প্রতিবেদনটি পুরোপুরি ইংরেজিতে তৈরি করে প্রকাশ করেছে বিবিএস। ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাতে প্রতিবেদনটি না তৈরি করায় ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। মূল বইটা পুরোপুরি ইংরেজিতে করা হয়েছে। আমি বারবার বলে আসছি, ইংরেজিকে সম্মান করি, খুবই প্রয়োজন আছে, কিন্তু প্রতিবেদনটাকে যদি দেশের মানুষের মধ্যে, জেলা, উপজেলা, প্রশাসনে, রাজনীতিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলেজে ছড়াতে হলে এটা বাংলায় করতে হবে। বাংলায় করলে প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। বোধগম্য হবে। আবার আজকে আপনাদের সামনে বলবো, এটাকে বাংলায় করেন। খুব সাবধানে বাংলা করেন। প-িত ব্যক্তিদের দেখিয়ে নেন, যাতে ভাষাটা সঠিক থাকে, পরিশুদ্ধ হয়।’
বিবিএসের দীর্ঘ কয়েক দশকের ইতিহাসে সবসময় ইংরেজিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। গত বছর পরিকল্পনামন্ত্রীর সুপারিশে প্রথমবার ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাতেও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এই প্রতিবেদন শুধু ইংরেজিতেই প্রকাশ করা হলো।
এম এ মান্নান আরও বলেন, ‘পরিসংখ্যানের গুরুত্ব যে কত বেশি, আমি বুঝিয়ে বলতে পারবো না। এর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। আমরা অনেকেই এখনও এ বিষয়ে সচেতন নই। তবে সচেতন হতে বাধ্য হবো। কারণ পরিসংখ্যানের কোনো বিকল্প নেই।’
অনুষ্ঠানে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী, বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
পরিসংখ্যা ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ইয়ামিন চৌধুরী বলেন, এবারের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আর্থ-সামাজিক অনেক সূচকেই বাংলাদেশের চেয়ে শুধু শ্রীলঙ্কাই কিছুটা এগিয়ে। ভারত, পাকিস্তান ও নেপালসহ অনেক দেশ আমাদের পেছনে রয়েছে।

%d bloggers like this: