July 6, 2020

পাবনায় গত ৩ সপ্তাহে কোভিড পজিটিভদের ৯০% শনাক্ত হয়েছে

সাধারণ ছুটি প্রত্যাহারের পর পাবনায় গত তিন সপ্তাহে করোনা ভাইরাস বিস্তারের গতি বেড়েছে ব্যাপক হারে। জেলায় এখন পর্যন্ত কোভিড পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন ৩৩৬ জন। এদের মধ্যে শেষ তিন সপ্তাহেই শনাক্ত হয়েছেন ৩০০ জন যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৯০ শতাংশ। সিভিল সার্জন অফিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের প্রধান ডাক্তার আব্দুর রহিম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ‘গত ১৬ এপ্রিল পাবনায় প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়। এর পরের ১৫ দিনে শনাক্ত হন মোট ৩৬ জন।’ ‘ঈদের পর জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে বাড়তে থাকে আক্রান্তের সংখ্যা। বর্তমানে পাবনায় শনাক্ত ৩৩৬ জনের মধ্যে ৩০০ জনই শনাক্ত হয়েছেন ১ থেকে ২২ জুনের মধ্যে।’
করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সংখ্যার বিচারে এই জেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে সদর উপজেলা। শনাক্তদের মধ্যে ২০১ জনই সদর উপজেলার।
শনাক্ত বিবেচনায় রাজশাহী বিভাগের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাবনা। এখানে করোনায় পাঁচ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত হওয়া গেছে। একই সময়ে জ্বর-শ্বাসকষ্টের উপসর্গ নিয়ে আরও ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দ্রুত সংক্রমণ বাড়লেও এই জেলার কোনো এলাকায় কার্যকরভাবে লকডাউনের সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডা. মেহেদি ইকবাল বলেন, রোববার পাবনা জেলা কোভিড ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এলাকাভিত্তিক লকডাউন না করে শুধু আক্রান্ত রোগীদের বাড়ি লকডাউনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাড়ি লকডাউন করে আক্রান্তের হোম আইসলেশন নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব। এজন্য পুর এলাকা লকডাউন করার প্রয়োজন নেই।
তবে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন পাবনা ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি লায়ন বেবি ইসলাম। তিনি বলেন, সংক্রমণ বাড়লেও পাবনায় কোথাও নিয়ম মানা হচ্ছে না। সম্ভাব্য আক্রান্তরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও পরীক্ষা করাতে পারছেন না। আক্রান্তরা শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
এদিকে পাবনায় করোনা সংক্রমণ দিন দিন বেড়েই চলছে। জেলার করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে। করোনা সংক্রমণের হার বিবেচনায় পাবনা সদর ও সুজানগর উপজেলাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, করোনা সংক্রমণের বিস্তার রোধে পাবনা জেলার ৯টি উপজেলাকে তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে পাবনা সদর ও সুজানগর উপজেলাকে রোড জোনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া এবং ভাঙ্গুড়া উপজেলাকে ইয়েলো জোন এবং বেড়া, সাঁথিয়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলাকে গ্রীন জোনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাবনায় এখন পর্যন্ত করোনা উপসর্গ নিয়ে ১২ জন এবং করোনায় আক্রান্ত হয়ে ছয়জনসহ ১৮ জন
মারা গেছেন।
পাবনার বেড়া উপজেলায় মা ও মেয়েসহ নতুন করে ৪ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে উপজেলায় করোনা আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা ৫ জন। তবে এর আগে শনাক্ত হওয়া একমাত্র রোগী গত ২০দিন আগেই সুস্থ হয়ে ওঠায় এতদিন বেড়া উপজেলা করোনামুক্ত ছিল বলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে। বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী ল্যাব থেকে মঙ্গলবার (২৩ জুন) পাওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী বেড়া পৌর এলাকার আলহেরা নগর মহল্লার মা তাসলিমা আক্তার (৪২) ও মেয়ে তাজরি আক্তার (১৫) করোনা পজিটিভ হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের পেঁচাকোলা গ্রামের হাসান আলী (২৪) করোনা পজিটিভ হয়েছে। অন্যদিকে এনায়েতপুর থানার মোকসেদুল ইসলাম (২৪) করোনা শনাক্ত হয়েছে। গত ১৪ জুন বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নমুনা দেওয়ার সময় মোকসেদুল ইসলাম বেড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বসবাস করছিলেন। তবে এখন তিনি তাঁর নিজ বাড়ি এনায়েতপুরে অবস্থান করছেন।
বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) জাহিদ হাসান সিদ্দিকী জানান, তাসলিমা আক্তার ও তাজরি আক্তারের নমুনা ১৬ জুন এবং হাসান আলীর নমুনা ১৭ জুন সংগ্রহ করা হয়েছিল। নমুনা সংগ্রহের সময় চারজনেরই করোনার উপসর্গ ছিল। কিন্তু এখন তাঁদের কারো শরীরেই তেমন উপসর্গ নেই। বেড়া উপজেলায় বাস করা তিনজনের বাড়িতে উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা গিয়ে লকডাউন নিশ্চিত করে এসেছেন। তাঁদেরকে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে আরও জানা যায়, করোনা সন্দেহে এ পর্যন্ত ১০৪ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলে তাদের মধ্যে ৯১ জনের ফলাফল পাওয়া যায়। মোট শনাক্ত হলেন ৫ জন। ইউএনও আসিফ আনাম সিদ্দিকী জানান, করোনায় আক্রান্ত দুইটি বাড়িই লকডাউন করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের পরিবারের জন্য খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। তাদের সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর নেওয়া হবে। তাদের পরিবারের সবাই সুস্থ আছেন ও অন্য কারো করোনার কোন লক্ষণ দেখা যায়নি।
পাবনার ভাঙ্গুড়ায় করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ উপজেলায় নতুন করে আরও ৩ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (২৪ জুন) বিকেলে আইইডিসিআর থেকে নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডাঃ হালিমা খানম। এদিকে ভাঙ্গুড়ায় করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা নিয়মিত ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিজ্ঞমহল চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
এদের একজন হলেন- পৌরসভার পাঘরঘাটা গ্রামের স্বনামধন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা, অপর দু’ব্যক্তি হলেন পার-ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের বাসিন্দা পূবালি ব্যাংক কর্মকর্তা এবং ভাঙ্গুড়া বাসস্ট্যান্ডের স্টেশনারী ব্যবসায়ী। কয়েকদিন আগে তাদের শরীরে করোনা উপসর্গ দেখা দিলে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআর-এ পাঠায়। আজ রাতে তাদের পজেটিভ রিপোর্ট পাওয়া যায়। তারা সকলেই হোমকোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান সহকারী সরকার হুমায়ুন কবির জানান, এ নিয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলায় মঙ্গলবার পর্যন্ত একজন মেডিকেল অফিসার ও আউট সোসিং স্বাস্থ্য কর্মীসহ মোট ১৭ ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হলেন। আর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৫৫৮ জনের এবং ইতোমধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৭ জন। তবে আক্রান্তদের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা: হালিমা খানম ওই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন,করোনা থেকে বাঁচতে হলে স্বাস্থ্য বিধি,সামাজিক দূরত্ব,মাস্ক ব্যবহার,হোমকোয়ারেন্টাইন প্রভৃতি মানার কোনো বিকল্প নেই।

%d bloggers like this: