July 3, 2020

মা মাছ শিকার, চলনবিলের জন্য অশনিসংকেত

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত চলনবিলে এসেছে বর্ষার নতুন পানি। পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে মা মাছ ধরতে নেমে পড়েছেন জেলেরা। নিষিদ্ধ বিভিন্ন জাল দিয়ে মাছ শিকার করছে তারা। তবে এই মা এবং ডিমওয়ালা মাছ নিধন বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর প্রদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে চলনবিলে মাছ উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত দেশের সর্ববৃহৎ বিলাঞ্চলে এখন চলছে অবৈধ নানা উপায়ে মা মাছ ও পোনা শিকার। আর এক শ্রেণির অসাধু জেলেরা বিলের বিভিন্ন পয়েন্টে বাদাই ও কারেন্ট জালসহ মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে দিনে ও রাতে মা মাছ শিকার করে হাট-বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি করলেও দেখার কেউ নেই।
চলনবিলের চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, গুরুদাসপুর, সিংড়া ও আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন নদী ও খালে বন্যার পানি আসায় বিভিন্ন হাট-বাজার, তাড়াশ ও সিংড়া মৎস্য আড়তে দেখা গেছে ডিমে পেট ভরপুর টেংরা, পাতাসী, পুঁটি, মলা, বোয়াল, শোল, মাগুরসহ দেশীয় প্রজাতির ২০ থেকে ২৫ প্রকার মা মাছ প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, সাধারণত জুন-জুলাই মাসে ডিম ছাড়ে মা মাছগুলো। বর্ষা শুরু হলেই চলনবিলের মাছগুলো ডিম ফুটাতে থাকে। কিন্তু এই সময়টাতে মাছ ধরা একেবারেই নিষিদ্ধ। ১৯৫০ সালের মৎস্য আইন অনুযায়ী ডিম এবং মা মাছগুলো শিকার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বিলে পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে মাছ শিকারে নেমে পড়েন জেলেরা। এতে জেলেদের জালে ধরা পড়ে নষ্ট হচ্ছে ডিমগুলো।
বর্ষাতে চলনবিলে নতুন পানি আসতে শুরু করেছে। আসছে নানা ধরনের মাছও। চলছে জেলেদের মাছ ধরার উৎসব। তবে না বুঝেই নিজেদের প্রয়োজনের তাগিতে শিকার করছেন মা এবং পোনা মাছ। এতে শুরুতেই প্রজনন ব্যহৃত হবে মাছের। এমনটা আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। কেননা যে মাছ এখন ডিম দেবে। সেই মাছ শিকার করে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এমনকি পোনা মাছ গুলোকেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয় সচেতন সমাজ মনে করেন এখনি উপজেলার বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালানো দরকার। তা না হলে ব্যপক ক্ষতির সমুক্ষীন হবো আমরা।
চলনবিল অধ্যুষিত এলাকা নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বিলশা এলাকায় গিয়ে দেখাযায় জেলেরা জাল দিয়ে পোনা মাছ শিকার করছেন এবং বিলের মাঝ খানে বাঁশের বেড়া দিয়ে মা মাছ শিকার করছেন। এসকল মা ও পোনা মাছ বিক্রি হচ্ছে উপজেলার বাণিজ্যনগরী চাঁচকৈড় মাছ বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে। চাঁচকৈড় বাজারে গিয়ে দেখাযায়, কয়েকজন মৎস ব্যবসায়ী মা বোয়াল মাছ,পুঁটি.টেংরা সোল ও টাঁকি মাছ বিক্রি করছে। দামটাও অনেক বেশি। সেউ সাথে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন জাতের পোনা মাছ। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক মৎস ব্যবসায়ী বলেন, আমরা কি করবো। জেলেরা আমাদের কাছে এসে পাইকারী এসব মা ও পোনা মাছ বিক্রি করে যাচ্ছে। আমরা আবার সেগুলো বাজারে আসা ক্রেতাদের মাঝে বিক্রয় করছি।
চলনবিলের জেলে রহমত আলী জানান, আমার জানামতে আমাদের কোন জেলে মা এবং পোনা মাছ শিকার করছে না। কারন তাদের বলা আছে মা ও পোনা মাছ যেন শিকার করা না হয়। তার পরেও যদি কেউ করে থাকে তাদের ব্যাপারে আমরা প্রশাসনকে অবহিত করবো।
চলনবিলের মাছ নিয়ে গবেষণা করা আবু বক্কর সিদ্দিকের মতে, এই সময়টা চলনবিলের মাছের জন্য বিপজ্জনক সময়। বিলে নতুন পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে মা মাছগুলো ডিম দেওয়া শুরু করে। বর্তমানে ডিমগুলো পরিপক্ব রয়েছে। বর্ষা শুরু হলেই ডিম ফুটানো শুরু হবে। কোনোভাবেই এই সময় মা মাছ শিকার করা যাবে না। কিন্তু চলনবিলে তার উল্টোটা ঘটে। এই নিধন বন্ধ করা না হলে চলনবিল এক সময় মাছশূন্য হয়ে পড়বে। চলনবিলের বিভিন্ন মৎস্য আড়তে প্রতি কেজি টেংরা ৭০০ টাকা, পাতাসী ১২০০ টাকা, মলা ৫০০ টাকা, বোয়াল ১ হাজার টাকা, শিং মাছ ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিমওয়ালা মাছ শিকারের ফলে মৎস্য উৎপাদন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন চলনবিলবাসী। চলনবিলে নির্বিকারে মা মাছ নিধন বংশবৃদ্ধিতে বাঁধার সৃষ্টি করছে। এ কারণে দেশীয় প্রায় ৩৯ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। এ এলাকায় মা মাছ নিধন রোধে প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সবার সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।

%d bloggers like this: