July 3, 2020

অপ্রদর্শিত অর্থের দায়মুক্তি নিয়ে স্ববিরোধিতা: মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু

দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেশে সামরিকতন্ত্রের অধীনে বেসামরিক সরকার গঠিত হয় ২০০৭ সালে। এই অস্বাভাবিক সরকার ‘ওয়ান-ইলেভেন সরকার’ নামে অভিহিত। কথিত দুর্নীতিমুক্ত সরকারটি নিদিষ্ট পরিমাণ অর্থ জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বা সম্পদ সাদা করার সুযোগ দিয়ে আইন প্রণয়ন করে। পরবর্তীকালে একজন বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ ও সম্পদ সম্পর্কে স্বপ্রণোদিত ঘোষণা দিলে ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত অর্থদ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে মুক্তি মিলত।
এভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগও দিয়েছিল ওত্ত্বাবধায়ক সরকার। এর আগে বিএনপি সরকারও একই রকম আইনের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকারও ওই আইনের ধারাবাহিকতা বহাল রাখে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে কিছু সংযোজন ও বিয়োজন ও পরিধি বৃদ্ধি করে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে উক্ত অর্থ অর্থনীতির মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ, ফ্ল্যাট বা বাড়ি ক্রয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারা সম্প্রতি ঘোষিত আসন্ন অর্থবছরের বাজেটেও বহাল রয়েছে। উদ্দেশ্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পাচার রোধ, সন্ত্রাসী অর্থায়ন রোধ প্রভৃতি। এই নিয়ে সীমাহীন বিতর্ক চলছে। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগই যে মসৃণ নয় তা হয়তো অনেকেই জানেন না। যারা জানেন তারাও এই আইনের সুযোগ নিতে শঙ্কা বোধ করেন। কেন?
একটি কারণ দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদকের ২০১৩ সালের ৬০নং সংশোধনী আইনের ২(ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে যে ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা বলা থাকুক না কেন এই আইনের বিধিমালা সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য পাইবে।’ অর্থাৎ ‘সুপ্রিমেসি অব এসিসি ল’ দৃঢ়প্রতিষ্ঠ।
সত্য ও জবাবদিহি কমিশনে অবৈধ সম্পদ ও অর্থ সম্পর্কে ঘোষণা দিয়ে আবেদন করলে কমিশন তা বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্নেষণের পর আর্থিক জরিমানার দ দিয়ে রায় ঘোষণার মাধ্যম আবেদন নিষ্পত্তি করা হলে দি ত ব্যক্তি উক্ত পরিমাণ জরিমানার অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে মুক্তি পেতেন। আইনের ভাষায় এই জরিমানা অবশ্যই অপরাধের জন্য দ বা শাস্তি। এভাবে অনেক আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়। সরকারি কোষাগারে জমাকৃত উক্ত পরিমাণ টাকা অর্থনীতির মূল স্রোতে চলে আসে এবং রাষ্ট্র কিঞ্চিৎ হলেও উপকৃত হয়।
তার মানে, ফলে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নতুন কিছু নয়। বর্তমান বাজেটেও ১০% কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে বাড়ি ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের পর স্তরভেদে নির্ধারিত হারে কর দিলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, এনবিআর টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করবে না মর্মে উল্লেখ আছে। এছাড়া অপ্রদর্শিত র্অথের বিপরীতে কর প্রদানের পর উক্ত অর্থ শিল্প খাতে বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করলে এনবিআর টাকার উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করবে না বা কর ফাঁকির দায়ে অভিযুক্ত করবে না। এসব সুযোগ ১৫/২০ বছর ধরে প্রচলিত থাকলেও প্রত্যেকবার বাজেট ঘোষণার পর দেশ রসাতলে গেল বলে বিতর্কের সৃষ্টি করা হয়।
এটা সত্য যে এই সুযোগ অনেকেই গ্রহণ করা থেকে বিরত আছেন। অপ্রদর্শিত অর্থে ফ্ল্যাট বা বাড়ির বিপরীতে কর আদায়ের পরিমাণও আশানুরূপ নয়। কিন্তু জঙ্গি অর্থায়ন, মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন দুস্কর্মে যেন এই কালো টাকা ব্যবহার না হয়, সেজন্য কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রেখেই দিতে হবে। এই কারণেই প্রতিবার বাজেটে এই চিন্তাভাবনার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে এই ব্যবস্থার সুফল নিতে গিয়ে কেউ যদি হেনস্তা হন, তবে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে সরকারের সদিচ্ছা পূর্ণতা পেতে বাধ্য। প্রয়োজন প্রণীত আইনগুলোর সামঞ্জস্যতা। নাগরিকরা রাষ্ট্রে প্রণীত আইনের প্রতি দৃঢ় আস্থা রেখে সে আইনের সুযোগ নেওয়ার পর যদি পরবর্তীকালে নাজেহাল হন তবে রাষ্ট্রকে দায় নিতে হবে। এখানেই কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে দুদক আইনের ‘সুপ্রিমেসি’ নিয়ে ভাবতে হবে।
আপাত বলবৎ সকল আইনের ওপর দুদক আইনের প্রাধান্য থাকায়, দুদক ওইসব নাগরিকের অর্থ ও সম্পদের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকার রাখে। শুধু এ কারণে এনবিআরের দায়মুক্তির ঘোষণা কার্যকর হয় না। আইন হয়, কিন্তু নাগরিক দুদক আইনের আতঙ্কের কারণে ওই কর অবকাশের সুযোগ নেয় না। কারণ সুযোগ নিলেই সে তালিকাভুক্ত হয়ে যাবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সৎ উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়ন করে সরকারের উদ্দেশ্য যদি সফল না হয় তবে সে আইনের কি কোনো প্রয়োজন আছে? এই ধরনের অসামঞ্জস্যতা, স্ববিরোধী আইন জনগণকে বিভ্রান্ত করে। সমালোচনা হয় কিন্তু রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রণিধানযোগ্য উন্নতি হয় না। সংবিধান আইন প্রণয়নের সূত্র বা ভিত্তি, যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ব্যত্যয় হলে দেশে সুশাসন হয় প্রশ্নবিদ্ধ। রাষ্ট্র প্রণীত এক আইনে পরিত্রাণ পাবে আবার একটা রাষ্ট্রের প্রণীত অন্য সংস্থার আইনে দ যোগের আশঙ্কায় সন্ত্রস্ত থাকবে কেন? এটা সভ্যতা ও ন্যায়ানুগ আইনের ও স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার পরিপন্থি।
সংবিধানের ৩৫(২) ধারা অনুযায়ী একই অপরাধ বা দুস্কর্মের দুইবার বিচার বা দ প্রদান করা যায় না। কিন্তু অপ্রদর্শিত অর্থ বা সম্পদ নিয়ে এই স্ববিরোধিতা গত ২০ বছর ভিন্ন ভিন্ন নীতিধারণকারী সরকার বহাল রেখেছে। সরকার ও জনগণের স্বার্থে পাচাররোধ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির মূল স্রোতে কালো অর্থকে সাদা করে বহমান রাখাই হলো বর্তমান সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই মহৎ চিন্তা ও নেতৃত্বের কারণেই আজ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এশিয়ার মধ্যে প্রথম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পরিচিত হয়েছে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে।
এখন সরকারের উচিত হবে উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনার প্রতি নতজানু না হয়ে আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিকদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। দুদক আইনের প্রাধান্য ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও সংশ্নিষ্ট আইন ও বিধানের মধ্যে সমন্বয় সাধন ও সরলীকরণের উদ্দেশ্যে এই স্ববিরোধিতা সংশোধন করা। লেখক : মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, মুক্তিযোদ্ধা; আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, সাবেক দুদক কমিশনার

%d bloggers like this: